IQNA

  গাদীরের খুতবায় «ওয়াখযুল মান খাযালাহু»-এর অর্থ পুনর্বিবেচনা

14:13 - June 14, 2026
সংবাদ: 3479302
নবী করীম (সা.)-এর কথা “যুগে সদর” (প্রাথমিক যুগ)-এ সঠিকভাবে বোঝার জন্য প্রাচীন ভাষাগত উৎসের দিকে ফিরে যাওয়া অত্যন্ত জরুরি, যাতে সময়ের সঙ্গে শব্দগুলোতে যেসব অতিরিক্ত অর্থ যুক্ত হয়েছে, তা সত্য উপলব্ধিতে বাধা না হয়। তাই আমাদের অনেকেই নবী (সা.)-এর গাদীরের দোয়ার শেষ বাক্যটিকে “অপমান করো তাকে যে তাকে অপমান করেছে” বলে জানি। কিন্তু প্রাচীন উৎসে ভাষাতাত্ত্বিক পর্যালোচনা দেখায় যে, এই বাক্যের অর্থ অনেক গভীরতর ও সতর্কবার্তামূলক। হুজ্জাতুল ইসলাম রেজা আমিরী সিরজানী, একজন বিশিষ্ট আলেম ও অধ্যাপক, শব্দ “খাযলান”-এর ব্যুৎপত্তিগত বিশ্লেষণ করে সতর্ক করেছেন যে, ওলায়াতের প্রতি উদাসীনতাই এই অভিশাপের প্রকৃত অর্থ।

আমিরী সিরজানী সনদ ও ভাষাতাত্ত্বিক পর্যালোচনার মাধ্যমে ওয়াখযুল মান খাযালাহুবাক্যটি বিশ্লেষণ করে অপমান করাসাহায্য ত্যাগ করা”-এর মধ্যকার পার্থক্য তুলে ধরেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, এই ভাষাগত পার্থক্য কীভাবে একজন শিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবনধারায় মৌলিক পরিবর্তন আনতে পারে। নিম্নে তাঁর বক্তব্যের বিস্তারিত অনুবাদ দেওয়া হলো:

রাসূলুল্লাহ (সা.) গাদীরের খুতবার শেষে একটি দোয়া করেছেন, যা সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত। তিনি বলেন: «اللهم وال من والاه و عاد من عاداه وانصر من نصره و اخذل من خذله»

এই পবিত্র দোয়ার শেষাংশ, অর্থাৎ «ওয়াখযুল মান খাযালাহু»-এর উপর বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। অনেক অনুবাদে এটিকে এভাবে প্রকাশ করা হয়েছে: হে আল্লাহ! যে তাকে অপমান করবে, তুমি তাকে অপমান করো। এই অনুবাদ ভুল নয়, কিন্তু পুরোপুরি সঠিকও নয়। আরবি ভাষায় এই বাক্যের অর্থ অনেক গভীরতর ও সতর্কবার্তামূলক, বিশেষ করে শিয়াদের জন্য। যদি এই বাক্য সঠিকভাবে বোঝা যায়, তাহলে একজন শিয়ার জীবনধারায় মৌলিক পরিবর্তন আসতে পারে।

বাক্যের অর্থে প্রবেশের আগে গবেষকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে নিই। গাদীরের হাদিসের এই শেষাংশটি শিয়া ও সুন্নি উভয় সূত্রে সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে এবং এটি অভ্যন্তরীণ ও বহির্মূলক উভয় ধরনের আলোচনায় দলিল হিসেবে গ্রহণযোগ্য।

সনদের ব্যাখ্যা: একটি উৎসের উল্লেখই যথেষ্ট। আবু বকর আল-বাযযার (মৃত্যু ২৯২ হিজরি) তাঁর গ্রন্থ আল-বাহরুয যাখখান (খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩৪)-এ এই রেওয়ায়েতটি সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন। গবেষকগণ এই উৎসটি দেখে সনদ যাচাই করে নিতে পারেন যে, হাদিসের শেষাংশ «ওয়াখযুল মান খাযালাহু» সহীহ সনদে বর্ণিত।

ভাষাগত অর্থ উপলব্ধি: আহলে বাইত (আ.)-এর রেওয়ায়েতে শব্দের অর্থ বোঝার জন্য যেকোনো অভিধানের উপর নির্ভর করা যায় না। ব্যবহৃত উৎসগুলোকে দুটি মৌলিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হতে হবে: প্রথমত, এগুলো প্রাচীন উৎস হতে হবে এবং সমকালীন বা পরবর্তীকালের রচনা হতে পারবে না। কারণ ভাষা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয় এবং শব্দে অতিরিক্ত অর্থ যুক্ত হয়। তাই যুগে সদর”-এর ভাষাগত অর্থ বোঝার জন্য প্রাচীন অভিধানের সাহায্য নেওয়া অপরিহার্য। দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হলো, এই উৎসগুলো শব্দের মূল অর্থ (মানা মাওদূউনলাহু/ موضوع‌له) বর্ণনা করবে। কারণ পরিভাষায় শব্দগুলো কখনো মূল অর্থে এবং কখনো প্রচলিত অর্থে ব্যবহৃত হয়। অধিকাংশ অভিধান প্রচলিত অর্থ বর্ণনা করে, কিন্তু আমাদের সঠিক বিশ্লেষণের জন্য মূল অর্থ জানা প্রয়োজন।

এমন একটি অভিধান যা উভয় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী, তা হলো মুজামু মাকায়ীসিল লুগাহইবনে ফারিস (মৃত্যু ৩৯৫ হিজরি)-এর রচনা। তিনি খ-য-লমদখলে লিখেছেন: আল-খাউ ওয়াদ-যালু ওয়াল-লাম, আসলুন ওয়াহিদুন, ইয়াদুল্লু আলা তারকিশ শাইয়ি ওয়াল কুউদি আনহু, ওয়াল খাযলানু তারকুল মাউনাহ। এই বাক্য অনুসারে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কথার সঠিক অর্থ স্পষ্ট হয়ে যায়। খাযলান ভাষায় অর্থ ত্যাগ করা এবং কাজ না করা

এখানে ভাষাগত মূল অর্থ ও প্রচলিত অর্থের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। প্রচলিত অনুবাদ (যে তাকে অপমান করবে, তুমি তাকে অপমান করো”) আমাদের মনে এই ধারণা জাগায় যে, অপমান করার জন্য কোনো কর্ম সম্পাদন করতে হয়। কিন্তু আরবি ভাষার মূলে খাযলঅর্থ কোনো কাজ না করাএই অর্থ শিয়া ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসারীদের জন্য এক তীব্র সতর্কবার্তা বহন করে: আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.)-এর প্রতি উদাসীন থাকা অথবা তাঁকে সাহায্য করার পথে অলসতা করা এটিই খাযলানের উদাহরণ। এমনকি যদি কেউ তাঁর পথে পাঁচ কদম অগ্রসর হয় কিন্তু যে কদমটি সে নিতে সক্ষম ছিল তা ত্যাগ করে, তাহলে সে খাযিলীনদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মহান অভিশাপ তার উপর বর্তাবে। প্রকৃতপক্ষে, মানুষের অবস্থান এখানে ভয় ও আশার মাঝামাঝি হয় আমরা নাসিরীন (সাহায্যকারী)-এর অন্তর্ভুক্ত, নয়তো খাযিলীন (ত্যাগকারী)-এর অন্তর্ভুক্ত।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা সাহিত্য ও গবেষণার্থীরা লক্ষ্য করেন, তা হলো «খাযালাহু» শব্দের সর্বনামের মূল উল্লেখ্য। এই সর্বনামটি গাদীরের ঘটনার দিকে নয়, বরং সরাসরি হযরত আমিরুল মুমিনীন আলী ইবনে আবি তালিব (আ.)-এর ব্যক্তিত্বের দিকে ফিরে যায়। এই ভাষাগত সূক্ষ্মতা একটি গভীর বার্তা বহন করে: আমাদের অঙ্গীকার শুধু গাদীরের উপলক্ষ বা নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বরং বিষয়টি হলো হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (আ.)-এর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন। অতএব, মানুষের জীবনের কোনো পর্যায়ে বালেগ হওয়ার সময় থেকে শুরু করে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হযরত আমিরুল মুমিনীন (আ.)-এর প্রতি উদাসীনতা দেখানো উচিত নয়। কারণ এখানে খাযলান-এর অর্থ হলো তাঁর সঙ্গে সম্পর্কের ত্যাগ এবং জীবনের সকল ক্ষেত্রে তাঁর মর্যাদার প্রতি অবহেলা।

উপরোক্ত আলোচনা ছিল হাদিসে গাদীর সম্পর্কিত পরবর্তী আলোচনার প্রস্তুতিমূলক ভূমিকা। আমিরুল মুমিনীন আলী (আ.)-এর ইমামতের সপক্ষে নকলী দলিলসমূহের পর্যালোচনায় আমাদেরকে দুটি মৌলিক অক্ষের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে: প্রথমটি সনদী দিক এবং দ্বিতীয়টি দালালী দিক

সনদী দিক বলতে কী বোঝায়? সনদী দিক হলো কোনো রেওয়ায়েতের রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের সঠিকতা যাচাই করা। কারণ এসব ঘটনা চৌদ্দশত বছরেরও বেশি পুরনো। তাই প্রমাণ করতে হয় যে, উক্ত কথাটি সত্যিই রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে উদ্ভূত হয়েছে। উল্লেখ্য যে, এই প্রমাণের প্রয়োজনীয়তা শুধু সুন্নি মাযহাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং শিয়া গ্রন্থসমূহেও এবং ইসলামের সকল মাযহাব ও ফিরকায় এটি প্রযোজ্য। কারণ কেউই বিনা দলিল ও বিশুদ্ধ সনদ ছাড়া কোনো কথা রাসূলুল্লাহ (সা.) বা আহলে বাইত (আ.)-এর দিকে সম্বন্ধ করতে পারেন না। এই কঠোর পদ্ধতিতে উৎসের বিশুদ্ধতা যাচাই করাকেই আমরা সনদী দিক বলে থাকি।

এর বিপরীতে রয়েছে দালালী আলোচনাদালালী আলোচনার উদ্দেশ্য হলো যখন আমরা প্রমাণ করি যে, কোনো কথা রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে উদ্ভূত হয়েছে (অর্থাৎ সনদী দিক প্রমাণিত হয়েছে), তখন আমাদেরকে বিশ্লেষণ করতে হয় যে, সেই কথাটির অর্থ ও দালালত কী। উদাহরণস্বরূপ, আমরা প্রমাণ করেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: «أنت مني بمنزلة هارون من موسى إلا أنه لا نبي بعدي» এবং এই রেওয়ায়েত সহীহাইন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। একইভাবে, হাদিসে সাকালাইন সহীহ মুসলিমে এবং «علي مع الحق و الحق مع علي» রেওয়ায়েতটি মুস্তাদরাকে হাকিম নিশাপুরীসহ বিভিন্ন উৎসে সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে। এছাড়া «خلقت أنا و علي من نور واحد» রেওয়ায়েতটি আবদুল্লাহ ইবনে আহমদ ইবনে হাম্বল সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন এবং «أنت الخليفة من بعدي» রেওয়ায়েতটিও সহীহ সনদে বর্ণিত। এখন, সনদ প্রমাণিত হওয়ার পর, এই রেওয়ায়েতগুলোর দালালী দিক পর্যালোচনা করতে হয় যে, এই বাক্যগুলো ঠিক কোন সত্যের দিকে ইঙ্গিত করছে।

এই হাদিসগুলো একই ওজনের নয়। যখন বলা হয়েছে «أنت الخليفة من بعدي» অথবা «سلموا علي بإمرة المؤمنين» (বিভিন্ন শব্দে) যেখানে আমিরুল মুমিনীনকে সাইয়্যেদুল মুসলিমীন ও আমিরুল মুমিনীন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে তখন এই রেওয়ায়েতটি হাদিসে মানযিলাত-এর সমান নয়। একটি রেওয়ায়েত স্পষ্টভাবে আমিরুল মুমিনীন (আ.)-এর খিলাফত ও ইমামত প্রকাশ করে, কিন্তু অন্য রেওয়ায়েতের জন্য আলোচনা ও দলিলের প্রয়োজন হয়। আমরা এই কারণেই একে দালালী আলোচনা বলে থাকি।

হাদিসে গাদীরের পর্যালোচনায় সর্বদা দুটি মৌলিক অক্ষের প্রতি গভীর মনোযোগ দেওয়া হয়: সনদী অক্ষ এবং দালালী অক্ষস্বাভাবিকভাবে, সদরে ইসলাম থেকে শুরু করে আমিরুল মুমিনীন (আ.)-এর যুগ হয়ে আজ পর্যন্ত শিয়া আলেমগণ উভয় দিকেই ব্যাপক গবেষণা করেছেন।

সনদী অক্ষে মূল ফোকাস থাকে সেই সাহাবীদের শ্রেণির উপর যাঁরা রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন। পরিভাষায় একে তাবাকায়ে সাহাবা বলা হয়। কোনো রেওয়ায়েতে সাহাবীদের সংখ্যা পরিভাষাগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, জালালুদ্দীন সুয়ূতী মনে করেন যে, যে রেওয়ায়েত দশজন সাহাবী বর্ণনা করেছেন, তা মুতাওয়াতিরএখানে মুতাওয়াতির বলতে বোঝানো হয়েছে কাট্টি ইয়াকীন-এর স্তরে পৌঁছানো যাতে হাদিসটি রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে উদ্ভূত হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ না থাকে। অবশ্যই এই মুতাওয়াতির পরবর্তী স্তরগুলোতেও বজায় থাকতে হবে; অর্থাৎ দ্বিতীয় স্তরে (তাবেয়ীন) এবং পরবর্তী স্তরগুলোতে হাদিস গ্রন্থসমূহ সংকলনের যুগ পর্যন্ত বর্ণনাকারীর সংখ্যা প্রয়োজনীয় স্তরে থাকতে হবে, যাতে রেওয়ায়েতটি মুতাওয়াতির হিসেবে বজায় থাকে।

 

অবশ্যই এ বিষয়ে বিভিন্ন মতবাদ রয়েছে। যেমন আবু বকর বাকিল্লানী মনে করেন, পাঁচের অধিক সাহাবী যে রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন, তা মুতাওয়াতির। মুতাওয়াতির রেওয়ায়েতের বৈশিষ্ট্য এই যে, বর্ণনাকারীর সংখ্যার কারণে এটি কাট্টি ইয়াকীন প্রদান করে এবং প্রত্যেক বর্ণনাকারীর ওসাকাত (বিশ্বস্ততা) যাচাইয়ের প্রয়োজন হয় না। শুধু বর্ণনাকারীর সংখ্যাই বিষয়টির সত্যতা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট।

এখন এই মানদণ্ডগুলোকে বিশুদ্ধ উৎসসমূহের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে যেমন আল্লামা আমিনী (রহ.)-এর গ্রন্থ «আল-গাদীর» এবং আল্লামা মীর হামিদ হুসাইন (রহ.)-এর «আবাকাতুল আনওয়ার»আমরা দেখতে পাই যে, আল্লামা আমিনী হাদিসে গাদীর বর্ণনাকারী সাহাবীর সংখ্যা ১১০ জন উল্লেখ করেছেন। এই সংখ্যা উল্লিখিত মানদণ্ডের (১০ বা ৫ জন) তুলনায় এত উঁচু স্তরের যে, মনে হয় আমরা নিজেরাই রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মজলিসে উপস্থিত ছিলাম এবং কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকে না।

এই গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল হলো আমি আল্লামা আমিনী ও আল্লামা মীর হামিদ হুসাইন (রহ.)-এর কাছে যেসব উৎস ছিল না, সেগুলোর ভিত্তিতে হাদিসে গাদীরের আরও ৩০ জনের অধিক সাহাবী খুঁজে পেয়েছি যাঁরা এই হাদিস বর্ণনা করেছেন, কিন্তু তাঁদের নাম «আল-গাদীর» গ্রন্থে উল্লেখ হয়নি। স্বাভাবিকভাবে, আরও ব্যাপক উৎসের প্রাপ্যতায় এই সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাবে। তাই আজকের যুগে, যখন গ্রন্থাগারিক সুবিধা ও উৎসের প্রাপ্যতা অনেক বেশি, তখন আমাদের দায়িত্ব হলো গাদীর ও আমিরুল মুমিনীন (আ.)-এর সকল বিষয়ে আরও গভীর গবেষণা করা এবং নতুন নতুন দিক উন্মোচন করা।

এই কথা তাবেয়ীনের স্তর-এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আল্লামা আমিনী (রহ.) তাঁর গ্রন্থে হাদিসে গাদীর বর্ণনাকারী তাবেয়ীনের সংখ্যা ৮৪ জন উল্লেখ করেছেন, কিন্তু আমাদের গবেষণায় এই সংখ্যা ১২০ জন-এ উন্নীত হয়েছে। এই ফলাফল প্রমাণ করে যে, হাদিসে গাদীর সকল রেওয়ায়েতি স্তরে মুতাওয়াতিরের উর্ধ্বে এবং সনদের দিক থেকে অতুলনীয় স্তরের নিশ্চয়তার অধিকারী।

হাদিসে গাদীরের সনদ-সংক্রান্ত আলোচনা এখানেই শেষ হয় না। বরং এই লেখকের বিশ্বাস ও গবেষণামূলক অনুসন্ধান অনুসারে (শুধু অনুমানভিত্তিক নয়), এই হাদিসের সত্যতা ও বিশুদ্ধতার নতুন নতুন অজানা দিক নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা করা যায় যা এখনও বৈজ্ঞানিক পরিসরে উঠে আসেনি। এসব বিষয় বিভিন্ন গ্রন্থে ছড়িয়ে আছে, কিন্তু উৎসের অপ্রাপ্যতা বা সুবিধার অভাবে আল্লামা মীর হামিদ হুসাইন ও আল্লামা আমিনী (রহ.)-এর মতো মহান ব্যক্তিদের রচনায় প্রতিফলিত হয়নি।

আজকের যুগে, যখন ডিজিটাল প্রাপ্যতা ও সুবিধা অপরিসীম, তখন একজন গবেষক নিজ ঘরে বসেই সেইসব গ্রন্থের সন্ধান পেতে পারেন, যেগুলোর জন্য পূর্ববর্তীগণ বিশ্বের বিভিন্ন গ্রন্থাগারে কষ্টকর সফর করতেন। এই সহজলভ্যতা নতুন প্রজন্মের গবেষকদের জন্য গাদীরের সত্য উন্মোচন এবং আমিরুল মুমিনীন (আ.)-এর সীরাত পুনর্বিবেচনার বৈজ্ঞানিক ও নৈতিক দায়িত্বকে দ্বিগুণ করে দিয়েছে।

 

রেওয়ায়েতে রিয়াহ ইবনে হারিস বর্ণনা করেন যে, একদল সাহাবী (আনসারদের মধ্য থেকে) রাহবা (শহরের ময়দান)-এ হযরত আমিরুল মুমিনীন (আ.)-এর খেদমতে উপস্থিত হলেন। এখানে এই সাহাবীদের সম্পর্কে দুটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: প্রথমত, তাঁরা মূল আরব ছিলেন এবং ভাষার সূক্ষ্মতা ও শব্দের গভীর অর্থ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখতেন। দ্বিতীয়ত, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবী হিসেবে তাঁদের সকল মুসলমানের কাছে বিশেষ মর্যাদা ছিল। আহলে সুন্নাতের দৃষ্টিতে সাহাবীদের বোঝাপড়া দলিলযোগ্য, আর শিয়াদের দৃষ্টিতে তাঁরা অন্তত ভাষাগত ও শব্দগত দিক থেকে অবশ্যই বিশ্বস্ত ও মূল উৎস।

এই দল যখন হযরত আমিরুল মুমিনীন (আ.)-এর খেদমতে পৌঁছালেন, তখন আরজ করলেন: «السلام علیک یا مولانا»এখানে হযরত যে প্রশ্নটি এই আনসারদের উদ্দেশে করেছিলেন, তা এই হাদিসের মূল কেন্দ্রবিন্দু। সাধারণত যখন আহলে বাইত (আ.) তাঁদের সম্মুখস্থ ব্যক্তিদের কোনো প্রশ্ন করেন, তখন তাঁদের উদ্দেশ্য কোনো তথ্য জানা নয় (কারণ তাঁদের কাছে কিছুই অজানা নয়), বরং এই প্রশ্নের মধ্যে একটি গভীর হিকমত নিহিত থাকে। মনে হয় এই প্রশ্নের মূল হিকমত হলো এই ঘটনাকে চিরস্থায়ী করা। কারণ যদি এই প্রশ্ন না উঠত, তাহলে এই সাক্ষাৎ শুধু একটি সাধারণ সালাম ও কুশল বিনিময়ে সীমাবদ্ধ থাকত এবং ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হতো না। এই প্রশ্নই এই ঘটনাকে কিয়ামত পর্যন্ত ইতিহাসে অমর করে রেখেছে।

হযরত বললেন: «কেমন করে আমি তোমাদের মাওলা হতে পারি, অথচ তোমরা আরবের স্বাধীন জাতিসাহিত্য ও ভাষাবিদগণ জানেন যে, এখানে «কওমে আরব» শব্দটি জাতিগত আরব হওয়ার দিকে ইঙ্গিত করে না, বরং এটি «স্বাধীনতা»-র ইঙ্গিতবাহী। কারণ সে যুগে আরব বংশের লোকেরা কখনো গোলাম হতেন না। তাই হযরতের এই প্রশ্নের মূল উদ্দেশ্য ছিল এই যে, তোমরা তো স্বাধীন মানুষ, গোলাম নও; তাহলে «ইয়া মাওলানা» বলে কীভাবে আমাকে তোমাদের মালিক ও অভিভাবক বলছ?

এই সাহাবীগণ, যাঁরা আরবও ছিলেন, উত্তরে বলেননি যে আমরা গোলাম নই বা আপনি আমাদের মালিক নন। তাঁরা এটাও বলেননি যে, আপনার প্রতি ভালোবাসার কারণে «আসসালামু আলাইকা ইয়া মাওলানা» বলেছি, অথবা আমরা আপনার নাসির ও শিয়া। বরং তাঁদের উত্তর ছিল সরাসরি হাদিসে গাদীর-এর প্রতি ইঙ্গিত যে, আমরা নিজেরাই রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে শুনেছি, যিনি গাদীরের দিনে বলেছিলেন: «مَن کُنتُ مَولاهُ فَهذا عَلِیٌ مَولاه»

এই হাদিসের অর্থ বোঝার জন্য সে যুগের আরব সমাজের প্রচলিত রীতি-নীতির দিকে লক্ষ্য করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ ইতিহাসে এটি সুপ্রতিষ্ঠিত যে, «আবদ» «মাওলা»-র মধ্যকার সম্পর্ক কোনো সাধারণ সম্পর্ক ছিল না। সে যুগের আরব সমাজে গোলামের নিজস্ব কোনো অধিকার ছিল না। তার সম্পত্তি, সময় এবং জীবনের সকল বিষয় মাওলার অধীনস্থ ছিল। বিবাহ, কর্মসংস্থান সবকিছু মাওলার অনুমতির উপর নির্ভরশীল ছিল। সে যুগের দৃষ্টিতে গোলাম ছিল তার মাওলার সম্পত্তি।

এটিই সেই সম্পর্ক যা রাসূলুল্লাহ (সা.) গাদীরের হাদিসের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। হযরত আমিরুল মুমিনীন (আ.) এবং আনসারদের একটি দল যাঁদের মধ্যে আবু আইয়ুব আনসারী (রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বিখ্যাত সাহাবী)ও ছিলেন এই অর্থ উপলব্ধি করেছিলেন। তাই তাঁরা হযরতের খেদমতে আরজ করেছিলেন: «السلام یا مولانا»

এই হাদিসের বিস্তারিত ব্যাখ্যা রয়েছে যে, কীভাবে আমিরুল মুমিনীন (আ.) তাশরীয় ও তাকভীন উভয় জগতে জীবন, সম্পত্তি ও মর্যাদার মালিক। অর্থাৎ তিনি একইসঙ্গে বাস্তব ও আইনগত উভয় প্রকার মালিক। এই হাদিসের বিস্তারিত ব্যাখ্যার জন্য অন্য একটি সুযোগের প্রয়োজন। আল্লাহ আমাদেরকে ইমামতের মারিফাত ও আহলে বাইত (আ.)-এর মারিফাত বুঝার তাওফীক দান করুন। 4356683#

 

captcha